মিয়ানমারকে ওআইসি: রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিন

ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমাদ আল-ওতাইমিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমাদ আল-ওতাইমিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ওআইসি। ঢাকা সফররত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোট ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমাদ আল-ওতাইমিন গতকাল প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ-বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এ আহ্বান জানান।

 

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা। তাদের দেশ মিয়ানমার উল্লেখ করে ওআইসি মহাসচিব বলেন, কিন্তু তারা সেখানে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের পরিচয় ও অস্তিত্বের স্বীকৃতি আজ জরুরি। তাদেরকে নিজ দেশে (মিয়ানমারে) ফিরিয়ে নিতে হবে। সেখানে তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে হবে। মিয়ানমারের সৃষ্ট এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশ বা প্রতিবেশী দেশগুলোকেই ভোগাচ্ছে না। এ নিয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ ভোগছে জানিয়ে মহাসচিব বলেন, তাদের জীবন বাঁচতে মানবিক সাহায্য দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেবল সাহায্য-সহায়তাই নয়, রোহিঙ্গা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে আমাদের কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে বয়ে চলেছে এবং সমপ্রতি রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে একটি আইল্যান্ডে তাদের অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসনে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমর্থন ব্যক্ত করে ওআইসি মহাসচিব বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সরকার তাদের জন্য দ্বীপে একটি শহর তৈরি করতে চায়। আমি আশা করি সেখানে তারা (রোহিঙ্গারা) সাধারণ নাগরিকদের মতো ভালো সুবিধাদি নিয়ে বসবাস করতে পারবেন। বাংলাদেশ সরকারের ওই উদ্যোগ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত জানিয়ে ড. ওতাইমিন বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে আমার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার নেতাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমরা পুঞ্জীভূত এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান চাই। সমস্যাটির সমাধানে কীভাবে সামনে অগ্রসর হওয়া যায় তা নিয়ে মিয়ানমারের কাছ থেকে রোডম্যাপ চেয়ে মহাসচিব বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে বসতে চাই, আলোচনা করতে চাই। আমাদের একটি রোডম্যাপ দিন। আপনারা (মিয়ানমার) তাদের (রোহিঙ্গা) মৌলিক মানবাধিকার অস্বীকার করতে পারেন না। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের ইচ্ছা এবং ভূমিকার প্রশংসা করেন ওআইসি মহাসচিব। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইনে জাতিসংঘের একাধিক প্রতিনিধিদল পাঠানোর সামপ্রতিক উদ্যোগের জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি। বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ বিশেষত; গত বছরে কূটনৈতিক জোন খ্যাত গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় উগ্রপন্থিদের বর্বর আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশেও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। এদের রুখতে ওআইসি সব সময় বাংলাদেশের পাশে আছে। পররাষ্ট্র দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ওআইসির প্রধান নির্বাহী ড. ওতাইমিন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মুসলিম বিশ্বের ওই জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসাবে বাংলাদেশের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ৭৫’র এই আগস্ট মাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। উল্লেখ্য, সৌদি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড. ওতাইমিন গত নভেম্বরে ওআইসি মহাসচিবের দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই তার প্রথম ঢাকা সফর। বুধবার মধ্যরাতে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। সফরের প্রথম কর্মসূচি হিসাবে বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বিকালে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্ধ্যায় তাঁর সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়োজিত ভোজসভায় যোগ দেন। আজ শুক্রবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থা সরজমিনে এবং তাদের প্রতি মুসলিম উম্মাহ তথা ওআইসি’র সংহতি প্রকাশে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে যাবেন তিনি। সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার মতবিনিময়ের সূচি রয়েছে। শনিবার মহাসচিব ঢাকা ছেড়ে যাবেন।

প্রধানমন্ত্রী-ওআইসি মহাসচিব বৈঠকে যা আলোচনা হয়েছে: বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ বিন আহমেদ আল-ওতাইমিনের বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেখানে ওআইসি মহাসচিব বলেন, ‘এই সংলাপ নেতৃবৃন্দের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করবে।’ বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম ব্রিফিং এ একথা জানান। তিনি বলেন, ওআইসির মহাসচিব অসংখ্য রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন ‘আপনি খুব উদার’। এ সময় তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইসলাম শান্তি ও সহনশীলতার ধর্ম। বৈঠকে ওআইসির মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমি সবসময় বলি যে আপনি একজন সফল নেতা এবং বিশ্বের মুসলিম নারীদের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ড. ওতাইমিন এ সময় বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশি শ্রমিকরা আন্তরিক, কঠোর পরিশ্রমী এবং পেশাদার। তিনি আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, আগামী বছর বাংলাদেশ ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলন এবং ওআইসি পর্যটন মন্ত্রীদের সম্মেলন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ওআইসি বাংলাদেশের নারীদের যেকোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারলে খুশি হবে। ওআইসি মহাসচিব বলেন, তার সংস্থা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিদ্যায় সদস্য দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি চালুর চিন্তা-ভাবনা করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। আমরা মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বলছি, কারণ আমরা শরণার্থীদের ছুড়ে ফেলতে পারি না। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, শরণার্থীরা যাতে ভালোভাবে থাকতে পারে এজন্য তার সরকার ইতিমধ্যে তাদের অস্থায়ী বসবাসের জন্য একটি দ্বীপ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে মহাসচিব বলেন, এটি খুবই চমৎকার সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় দেশের বর্ডার গার্ডের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, এই দুই দানবের বিরুদ্ধে তার সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং এর প্রতিরোধে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করেছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনে হালাল ল্যাবরেটরীর উদ্বোধন করবেন  আজ: এদিকে সফররত ওআইসি মহাসচিব আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নবনির্মিত ‘হালাল ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরী’ উদ্বোধন করবেন। তিনি ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে মুসলিম উম্মাহ এবং ওআইসির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলেও জানানো হয়েছে। সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত বার্তায় জানানো হয়, ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। ধর্মসচিব মো. আবদুল জলিল বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামা এবং ইসলামী চিন্তাবিদরা এতে অংশ নেবেন।

Leave a Reply