গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধী দল গুরুত্বপূর্ণ :শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা Sirisena

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা

তিনদিনের সফর শেষে ঢাকা ছেড়ে গেছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। গতকাল দুপুরে কলম্বোর উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী প্রেসিডেন্টকে বিমানবন্দরে আন্তরিক বিদায় জানান। হাই প্রোফাইল ওই সফরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা-কলম্বো ১৪টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।

সফরকালে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম এবং প্রধানমন্ত্রী তনয়া সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে তার। জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তিনি। বঙ্গভবনের দরবার হলে তার সম্মানে দেয়া প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং সেখানে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাও উপভোগ করেন তিনি।

বিদায়ের আগে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার দপ্তরের তরফে ঢাকার কর্মসূচি বিষয়ক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতাসহ দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার বৈঠক ও সাক্ষাতের বিস্তারিত (সচিত্র) প্রকাশ করা হয়। সফরের দ্বিতীয় দিনে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিষয়ক প্রেসিডেন্টের দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- বিরোধী নেতার সঙ্গে আলোচনায় প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা স্পষ্ট করেই বলেছেন, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা উচিত। এই বিরোধী দলই সরকারকে সঠিক পথে রাখতে সহায়তা করবে। জাতীয়  সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শুক্রবার সিরিসেনার সঙ্গে তার হোটেল সোনারগাঁওয়ে সাক্ষাৎ করেন।

প্রায় আধঘণ্টা স্থায়ী ওই সাক্ষাৎ-বৈঠকে সিরিসেনা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক একটি দেশে বিরোধী দল খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়- বাংলাদেশের কয়েকটি উচ্চপদে যেমন প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বিরোধী দলের প্রধানের পদে নারী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। বৈঠকে তিনি জানান, তাদের দেশেও পার্লামেন্টে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসা প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সফরের তৃতীয় ও শেষ দিনে ঢাকার একটি বিজনেট ইভেন্টে অংশ নেন তিনি।

গতকাল সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিআইডিএ) ও মেট্রোপলিটন চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস ডায়ালগ : মোবিং টুওয়ার্ডস গ্রেটার ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং শ্রীলঙ্কার সফররত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল এই সংলাপে অংশ নেন। এতে তারা দুই দেশের ব্যবসাক্ষেত্রে উন্নয়নের উপায় ও তা আরো বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর বিশেষ করে ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ)’ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, ‘এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে বাণিজ্য ও ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাভি করুনানায়েকে এফটিএকে দুই দেশের ‘উইন-উইন সিচ্যুয়েশন’ নিশ্চিতে একটি যন্ত্র উল্লেখ করে বলেন, এই চুক্তি দুই দেশ একে অপরকে বিনিয়োগে সহায়তা করবে এবং দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবে। এই বাণিজ্য সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়কারী (এসডিজি বিষয়ক) মো. আবুল কালাম আজাদ, বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবির, এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মন্‌জুর ও লাফস্‌ হোল্ডিংস লিমিটেড চেয়ারম্যান ডব্লিউ কেএইচ উইগাপিতিয়া অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন।

২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এটি ছিল সিরিসেনার প্রথম বাংলাদেশ সফর। এর আগে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে তিনি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্টের সমাপনীতে ৩৫ দফা যৌথ বিবৃতি সই হয়েছে। সেখানে সফরের বিস্তারিত বর্ণনা এবং আগামীর পথনির্দেশনা রয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে যা আছে: শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সফরে সই হওয়া যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে- আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা।

এক্ষেত্রে বিমসটেক ও সার্কের মতো জোটের মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই দেশ। দু-দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদের হুমকি বেড়েছে বলে স্বীকার করেছেন। তারা এ নিয়ে উভয় দেশ ও দেশের বাইরে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে আগামী বছর সহিষ্ণুতা, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং বহুত্ববাদ নিয়ে একটি ব্যাপক ভিত্তিক সংলাপ আয়োজনে দুই দেশ একমত হয়েছে।

Leave a Reply