স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা: ওদের খাবারে প্লাস্টিক

Children

বাজারের চিপস, ওয়েফার, চকোলেট ও জুসে কার্বোহাইড্রেড, মেলামিন অতিমাত্রায় থাকায় শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হলেও এসব খাবারের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করে তোলা হচ্ছে। অথচ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক মিশিয়ে সেগুলোকে করা হচ্ছে আরও বিষাক্ত। কারণ সামান্য ঘষা বা নড়াচড়াতে এসব খেলনা থেকে প্লাস্টিক কণা খাবারে মিশে যায়। ওটাই খাচ্ছে শিশুরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এসব খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের খেলনা মিশিয়ে কতটা ক্ষতিকর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবেই বলা যায় একটা মোড়কের ভেতরে খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক মেশানো হচ্ছে, আর এটা ক্ষতিকর হতে বাধ্য। কারণ, প্লাস্টিকের ঘর্ষণে গুঁড়ো পড়তে থাকে, রং মিশতে থাকে, আর এসব খাবারের রং কিসের সেটাও আমরা জানি। এটা চোখ বুজেই বলে দেয়া যায়, কতটা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছি আমরা শিশুদের। কোনও সন্দেহ নেই যে এগুলো শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ভবিষ্যৎ হুমকি হয়ে কাজ করছে।

অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান শিশুখাদ্যের প্রকৃতি ও গুণগত মানের একটা স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়েছে। এক্ষেত্রে সহজপাচ্য, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে মানা হচ্ছে না এ মানদণ্ড। ফলে সেখানে নানা ধরনের চিপস, ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি চকোলেট, চিত্তাকর্ষক রঙে রঙিন ওয়েফারসহ হরেক রকমের খাবারে বাজার হয়ে গেছে সয়লাব। বিক্রিবাট্টা বেশ ভালো হওয়ায় বিভিন্ন বিপণিবিতানে দেখা যায় এসবই থরে থরে সাজানো। চিত্তাকর্ষক ও লোভনীয় মোড়কের পাশাপাশি শিশুদের আকৃষ্ট করতে এসব পণ্যে উপহার হিসেবে দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের খেলনা।

নগরীর বিভিন্ন স্থানে সেঁটে দেয়া বিলবোর্ড কিংবা টেলিভিশন দেখে বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে পছন্দসই নানা রকম খেলনা উপহারের কথা জানছে শিশুরা। তার পর সময়-সুযোগ বুঝে তারা অভিভাবকদের কাছে এসব পণ্য কেনার আবদার করে বসছে। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির তৈরিকৃত এসব শিশুখাদ্যের সঙ্গে উপহার হিসেবে যে অতি ক্ষুদ্রাকৃতির খেলনা দেয়া হচ্ছে, তা খাবারের সঙ্গে শিশুরা মুখে দিলে অনেক সময় পেটে গিয়ে ঘটছে প্রাণহানির মতো ভয়াবহ ঘটনা।

বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি চিপসের প্যাকেটের ভেতরে উপহার হিসেবে দেয়া ক্ষুদ্রাকৃতির খেলনা গলায় আটকে প্রাণ হারায় ঝালকাঠির শিশু তামিম। শিশুদের স্বভাবসিদ্ধ পছন্দে নয় মাস বয়সী তামিম চিপস খেতে গেলে এর প্যাকেটের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্রাকৃতির খেলনা প্রাণই কেড়ে নিয়েছে তার।

বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী কিছু কোম্পানির বিস্কুটের প্যাকেটে মিলছে লাল রঙের এক ইঞ্চি আকারের প্লাস্টিকের হরিণ ও ক্ষুদ্রাকৃতির খেলনা বাঘ। জনপ্রিয় কিছু ব্র্যান্ডের পিলো চকোলেট ওয়েফারের সঙ্গেও দেয়া হচ্ছে নানা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্লাস্টিকের প্রাণী। এক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে কোনো সতর্কতা বার্তা না থাকায় ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ছে। অন্যদিকে সেখানে বলা হয়নি, এসব খেলনা কত বছর বয়সী শিশুদের উপযোগী।

শিশু বিশেষজ্ঞরা জানালেন, বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ শিশুরা স্থূলতা ও ‍উচ্চরক্ত চাপে ভুগছে, যার প্রধান কারণ শিশুদের এসব বাইরের খাবার। স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এতে তারা প্রচণ্ড স্বাস্থ্য হুমকিতে পড়ছে। অথচ এসব কিছুর পরোয়া না করে মাত্রাতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেড ও মেলামিন সমৃদ্ধ চিপস, চকোলেট ও ওয়েফারসহ নানা রকমের শিশুখাদ্যে এখন বাজার সয়লাব। দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো থাকে এসব শিশু খাদ্যের আকর্ষণীয় প্যাকেট, দামটাও হাতের নাগালে। আর প্যাকেটের গায়ে ফ্রিতে পাওয়া খেলনা দেখে শিশুরা হয়ে ওঠে আরও আগ্রহী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাওসার বিপ্লব এটিকে আখ্যায়িত করলেন কেবলই ব্যবসার মুনাফা হিসেবে। এটা এক ধরনের প্রণোদনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাবারের দোকানে শিশুদের জন্য খেলার জায়গাসহ নানকিছু করে, যেখানে খাবারটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, শুধু শিশুদের সময় কাটানোর জন্য অভিভাবকরা সেখানে গিয়ে থাকেন। তবে, এসব খেলনার জন্য বাবা-মাসহ অভিভাকরা যেন শিশুদের কাছে জিম্মি না হয়ে যান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এসব খেলনা পেতে পেতে বাবামা যেন কন্ডিশনড না হয়ে যান, সেই দিকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিদিনের জন্য যদি এটা হয়ে যায় তাহলে মারাত্মক সমস্যা হিসেবে একে অভিহিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুবর্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মানসুবা তাবাসসুম হক বলেন, চিপস ব্রেইস সেল ড্যামেজ করে দেয়, বাচ্চাদের হাইপার করে দেয়, সে তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। ঘুমাচ্ছে না, ক্ষুধা পাচ্ছে না ।

গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কাজী রকিবুল ইসলাম এসব খাবারের বিষয়ে বলেন, এ সব খাবারের অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেড অতিরিক্ত মাত্রায় থাকে, কিছু কালারিং এজেন্ট (বিভিন্ন রং) থাকে যেগুলো একেবারেই খাবার অনুপযোগী, যেগুলোতে নানা ধরনের কেমিক্যাল থাকে, আবার মেলামিন নামের একটি পদার্থ থাকে। কিছু-কিছু খাবারে এই মেলামিন সহনীয় মাত্রায় থাকলেও বেশিরভাগ শিশু খাদ্যে একটি অসহনীয় পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, এসব উপাদানের কারণে শিশুরা পেটের পীড়া, চোখের সমস্যা, ডায়রিয়া, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি এবং হৃদরোগের ঝুঁকিতে পরে। সবচেয়ে বড় সমস্যা শিশুদের যেটা হয় তা হলো, এসব খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে সাধারণ এবং পুষ্টিকর খাবার তখন শিশুরা খেতে চায় না। যার কারণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং শরীর গঠিত হয় না।

সিটিজি টাইমস

Leave a Reply